গরুর মাংস কতটুকু খাওয়া নিরাপদ, কীভাবে খেলে ঝুঁকি কম, জানালেন পুষ্টিবিদ

অনেকেরই বিশ্বাস, গরুর মাংস খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। এই মাংসে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি থাকায় কেউ কেউ গরুর মাংস খাওয়া এড়িয়ে  চলেন। তবে পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, গরুর মাংসের যেমন ক্ষতিকর দিক রয়েছে, একইভাবে এর উপকারিতাও রয়েছে। গরুর মাংস থেকে যেসব পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়, তা অন্যসব খাবার থেকে পাওয়া অনেক কঠিন।

এ অবস্থায় গরুর মাংস খাওয়া আপনার জন্য উপকারী না ক্ষতিকর, সেটি নির্ভর করছে আপনি কী পরিমাণ খাচ্ছেন, কেমন নিয়ম মেনে চলছেন তার ওপর। এ ব্যাপারে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাহলে গরুর মাংস খাওয়ার নিয়ম ও পরিমাণ জেনে নেয়া যাক।

পুষ্টিগুণ:
পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, গরুর মাংসে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিনস, মিনারেলস বা খনিজ উপাদান রয়েছে। যেমন- জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ইত্যাদি। আবার ভিটামিনের মধ্যে ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬, বি১২ রয়েছে। এসব পুষ্টিকর উপাদান আমাদের পেশি, দাঁত ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা পালন করে।

ত্বক বা চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো রাখা, শরীরের বৃদ্ধি ও বুদ্ধি বাড়াতে সহায়তা, ক্ষত নিরাময়, দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখা, অলসতা, ক্লান্তি বা অসাড়তা দূর করা, ডায়েরিয়া প্রতিরোধ, রক্তস্বল্পতা দূর করা, খাবার থেকে শক্তি সরবরাহ করা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে গরুর মাংস।

কার জন্য কতটুকু প্রোটিন প্রয়োজন:
গরুর মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি থাকে। মগজ ও কলিজায় প্রোটিন থাকলেও এর পরিমাণ কম। তবে এর অধিকাংশজুড়ে কোলেস্টেরল। পুষ্টিবিদ চৌধুরী তাসনিম হাসিন জানিয়েছেন, মূলত ওজনের ওপর নির্ভর করে প্রতিদিনের প্রোটিনের চাহিদা। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তির আদর্শ ওজন ৫০ কেজি। তাহলে তার সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন ৫০ গ্রামের মতো প্রোটিন প্রয়োজন। কিন্তু কিডনি জটিলতা থাকলে প্রতিদিন ২৫ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করবেন তিনি। অর্থাৎ, স্বাভাবিকের অর্ধেক।

মেয়েদের মাসিক বা গর্ভবতী অবস্থায় এই পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হবে। আদর্শ ওজন ৫০ কেজি হলে দিনে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন গ্রহণ করবেন তারা। আবার যাদের ওজন আদর্শের থেকে কম, তারা বেশি বেশি প্রোটিন খাবেন। কিন্তু কারোরই দিনে ৭০ গ্রামের বেশি এবং সপ্তাহে ৫০০ গ্রামের বেশি প্রোটিন গ্রহণ করা ঠিক নয়।

প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে প্রোটিন থাকে ২৬ গ্রাম এবং ফ্যাট থাকে ২ গ্রাম। এর অর্থ, প্রতিদিনের প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য ২৭০ গ্রাম মাংস খাওয়া ঠিক হবে না। কারণ, দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা কেবল একটি খাবার থেকে নয়, বরং অন্যান্য সব খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।

কতটুকু খাওয়া নিরাপদ:
কুরবানির ঈদের পর কয়েকদিন গরুর মাংস একটু বেশিই খাওয়া হয়। এ জন্য এই কয়েকদিন প্রোটিনসমৃদ্ধ অন্যসব খাবার কিছুটা এড়িয়ে চলাই ভালো। তবে প্রতিদিন টানা মাংস খাওয়া ঠিক নয়। এ ব্যাপারে পুষ্টিবিদ তাসনিম হাসিন বলেন, গরুর মাংস খাওয়ার নিরাপদ মাত্রা হচ্ছে সপ্তাহে দুই দিন, মোট তিন থেকে পাঁচ বেলা খাওয়া যাবে। দু’দিনে মোট ১৫৪ গ্রাম খেতে পারবেন। সপ্তাহের এই দু’দিন প্রতি বেলায় খাবার সময় মাংসের পরিমাণ ১৬ থেকে ২৬ গ্রামের বেশি হওয়া যাবে না।

অর্থাৎ, প্রতি বেলা বাসা-বাড়িতে রান্না করা ২/৩ টুকরোর বেশি মাংস খাওয়া যাবে না। আর ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাইপার-টেনশন বা কিডনি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ মতো মাংস খেতে হবে। সাধারণত সপ্তাহে এক থেকে দুই বেলা মাংস খেলে কোনো ঝুঁকি থাকে না। আর চিকিৎসকরা যদি খেতে নিষেধ করেন, তাহলে খাওয়া যাবে না।

বয়স, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ ও শারীরিক পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষের প্রতিদিন ১২০০ থেকে ২০০০ ক্যালরির প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় কেউ যদি সপ্তাহের এক বেলায় ২৫ গ্রাম চর্বিহীন মাংস (মাঝারি আকারের ২/৩ টুকরো) খান, তাহলে এই পরিমাণ থেকে হয়তো ৬২ ক্যালরি মিলবে, যা প্রতিদিনের চাহিদার ৩ থেকে ৫ শতাংশ ক্যালরি সরবরাহ করবে। এ জন্য গরুর মাংস মানেই হাই ক্যালরি, এমনটা ভাবা ভুল।

এদিকে অনেকের ধারণা, গরুর মাংসে কোলেস্টেরলের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, তারা হয়তো জানেন না যে, একটি মুরগির ডিমের কুসুমে ১৯০ মিলিগ্রাম ভালো কোলেস্টেরল থাকে, যা চর্বি ছাড়া ২১০ গ্রাম গরুর মাংসের সমান। এ জন্য গরুর মাংস মানেই কোলেস্টেরল বেশি, এমন ধারণা ভুল বলে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদ তাসনিম হাসিন।

কীভাবে খেলে ঝুঁকি কম:
গরুর মাংস কতটা নিরাপদ, সেটি নির্ভর করে আপনার কাটা ও রান্নার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের একটি হেলথ জার্নাল জানিয়েছে, গরুর শরীরে দুটি অংশে চর্বির পরিমাণ কম থাকে। একটি গরুর পেছনের রানের উপরের ফোলা অংশের মাংস (রাউন্ড) এবং দ্বিতীয়টি পেছনের দিকের উপরের অংশের মাংস (সেরলয়েন)। তবে রান্নার আগে যদি মাংসের বাইরে থাকা চর্বি কেটে ফেলা যায়, তাহলে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়। এ জন্য রান্নার আগেই মাংসের ওপর থাকা চর্বি কেটে ছাড়িয়ে নিতে হবে। তাই মাংস কাটার সময় ছোট ছোট টুকরো করার চেষ্টা করুন। মাংস যত ছোট হবে, তাতে চর্বির পরিমাণও তত কমে যাবে।

এছাড়া গরুর মাংস কিমা বা বাটায় চর্বি অনেক কম থাকে। মাংস কাটা হলে তা ভালোভাবে ধুয়ে নিয়ে গরম পানিতে কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে নিতে হবে। তারপর পানিতে চর্বির স্তর ভেসে উঠবে। মাংস কিছুক্ষণ ফুটে উঠার পর পানি ফেলে দিতে হবে। যদিও পানি ফেলে দেয়ার কারণে মাংস থেকে চর্বি ছাড়াও কিছুটা ভিটামিনস ও মিনারেলস বের হয়ে যায়। এখন সেদ্ধ মাংস কম তেল দিয়ে রান্না করতে হবে। তেলের বিপরীতে ঘি, মাখন ও ডালডার মতো উপকরণ ব্যবহার না করাই ভালো।

পুষ্টিবিদ তাসনিম হাসিন বলেন, মাংসে বিদ্যমান ফ্যাট কমানোর জন্য লেবুর রস, টক দই বা ভিনেগার দিয়ে রান্না করতে পারেন। অধিক তেল-মশলা দিয়ে কসিয়ে ভুনা করে না খাওয়াই ভালো। বরং ঝোল ঝোল করে রান্না করে খাওয়ার সময় ঝোল বাদ রেখে খাওয়া ভালো। গরুর মাংস যদি আগুনে ঝলসে যায়, তাহলে এর চর্বি কমে যায়। এ জন্য গ্রিল, শিক কাবাব, জালি কাবাব পুড়িয়ে খাওয়া হলে ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে। পরিমাণে কম খাওয়ার জন্য মাংসের সঙ্গে সবজি যেমন- লাই, পেঁপে, ফুলকপি, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি দিয়ে রান্না করতে পারেন।

শেয়ার এবং ফলো করুন: