কবির আহমদ ফারুক ৷ লক্ষ্মীপুর
মাঘ মাস এলেই একসময় চন্দ্রগঞ্জে অন্যরকম এক আবহ নেমে আসত। রামচন্দ্রপুর গ্রামের হযরত দেওয়ান শাহ (রাঃ) মাজার প্রাঙ্গণ ঘিরে শুরু হতো বর্ণিল আয়োজন-নাগরদোলা, পুতুলনাচ, লোকজ পণ্যের দোকান, ভক্তদের ভিড় আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মিশ্রণে জমে উঠত ঐতিহ্যবাহী দেওয়ান শাহ মেলা। প্রায় সাড়ে চার শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করা সেই মেলা এবারও বসছে না।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী ৪৩৮তম হযরত দেওয়ান শাহ (রাঃ) মেলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় গত বছরের মতো এবারও অনুমোদন পায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চন্দ্রগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোরশেদ আলম।
সুফি সাধকের স্মৃতিতে গড়ে ওঠা মেলা
ইতিহাস বলছে, প্রায় ৪৩৮-৪৪০ বছর আগে মক্কা থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চন্দ্রগঞ্জের রামচন্দ্রপুর গ্রামে এসে আস্তানা গড়েন সুফি সাধক ফকির দেওয়ান শাহ (রাঃ)। এখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। তাঁর মাজারকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এই মেলা-যা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিন থেকে সপ্তাহব্যাপী এই মেলা বসত। তারও দুই সপ্তাহ আগে থেকেই সাজ সাজ রব পড়ে যেত মাজার প্রাঙ্গণে। দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। মাজারে হতো ওরস ও মাহফিল, পাশাপাশি চলত লোকজ বিনোদন আর গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা ঘোরানো বেচাকেনা।
সময়ের সাথে বদল, বিতর্ক আর শঙ্কা
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মেলার চেহারাও বদলাতে শুরু করে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহের আড়ালে মেলার নামে জুয়া, মাদক ও অশ্লীল কার্যকলাপের অভিযোগ উঠতে থাকে। সচেতন মহলের মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর প্রথমবারের মতো মেলার অনুমোদন বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।
২০১৯ সালের এক মর্মান্তিক ঘটনাও এখনো স্থানীয়দের মনে দাগ কেটে আছে। দেওয়ান শাহ মেলার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার পর থেকে মেলাকে ঘিরে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
মেলা না হওয়ায় স্বস্তি, তবু শূন্যতা
এবারও মেলা না হওয়ায় এলাকাবাসীর একাংশের মধ্যে হতাশা থাকলেও, বড় একটি অংশ এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। কারণ, মেলার সময় আশপাশের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও একটি কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক দীর্ঘদিন বন্ধ রাখতে হতো। পাশাপাশি জুয়া ও মাদককে ঘিরে এলাকায় প্রায়ই বিশৃঙ্খলা লেগে থাকত।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘মেলা আমাদের ঐতিহ্য ঠিকই, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর কারণে সমস্যাই বেশি হচ্ছিল। তাই মেলা না হওয়ায় শান্তি আছে।’
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ মোরশেদ আলম জানান, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন যৌথভাবে মেলার অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে মেলার স্থানসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে কোনো জেলা থেকে কেউ মেলার মালামাল নিয়ে আসতে না পারে।
তিনি আরও বলেন, “বিভিন্ন জেলা থেকে যারা প্রতিবছর মেলার জন্য মালামাল নিয়ে আসেন, তাদেরকে এ বছর না আসার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ মালামাল নিয়ে এলে শাহী সিএনজি স্টেশন এলাকাতেই মালবাহী যানবাহন আটক করা হবে।”
ঐতিহ্য ও বাস্তবতার টানাপোড়েন
চন্দ্রগঞ্জ হযরত দেওয়ান শাহ (রাঃ) মেলা আজ তাই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, সুফি সাধকের স্মৃতিবিজড়িত ধর্মীয় মিলনমেলা-অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক অবক্ষয় আর নিরাপত্তার শঙ্কা।
৪৩৮ বছরের ইতিহাসে টানা দ্বিতীয়বারের মতো মেলা বন্ধ থাকায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-এই ঐতিহ্য কি আবার শুদ্ধ রূপে ফিরবে, নাকি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে চন্দ্রগঞ্জের সেই চেনা মেলার কোলাহল?
