আল মামুন শিপন-লক্ষ্মীপুর:
একটি ছোট্ট ভাড়া বাসা৷ সেখানে ছিল একটি মায়ের স্বপ্ন, তিন মেয়ের হাসি আর ভবিষ্যতের হাজারো পরিকল্পনা। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের নির্মমতায় সেই ঘর আজ পরিণত হয়েছে শোকের নিস্তব্ধতায়। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় ঘরে ঢুকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আহত কিশোরী ইকরা বেগমও (১৭) শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানল। এর মধ্য দিয়ে একই পরিবারের চারজনের জীবনাবসান হলো এক হৃদয়বিদারক ঘটনায়।
বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে ইকরা মারা যায়। এর আগে সকালে তার মা শাহীনুর বেগম (৪০), ছোট বোন সিপা আক্তার (১০) এবং বড় বোন ছায়মা আক্তার (২১) প্রাণ হারান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা সংলগ্ন নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন শাহীনুর বেগম ও তার তিন মেয়ে। সেই ঘরেই নেমে আসে বিভীষিকার কালো ছায়া। হামলার শিকার চারজনের মধ্যে দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই বোনের মৃত্যু হয়।
পুলিশ দুপুরে ঘটনাস্থল থেকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে। চারদিকে তখন শুধু স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের স্তব্ধতা। যে ঘরে প্রতিদিন মেয়েদের হাসির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন শুধু শোক আর দীর্ঘশ্বাস।
এদিকে ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অন্তর মজুমদার (২৮) নামে এক যুবককে আটক করেন। পরে উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর আড়াইটার দিকে তারও মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা অন্তর মজুমদার রায়পুর এলাকায় ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মামুনুর রশিদ নিশ্চিত করেছেন।
তবে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হামলাকারীর সঙ্গে নিহত পরিবারের কোনো পূর্বপরিচয় ছিল কি না, কোনো বিরোধ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল কি না-এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
একটি পরিবারের চারটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই ঘটনা পুরো রায়পুরকে শোকাহত করেছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, এমন নির্মম দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি। মায়ের আঁচলের ছায়ায় বেড়ে ওঠা তিন মেয়ের জীবন একদিনেই নিভে গেল। আর যে ঘটনায় এই মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছিল, সেই ঘটনার অভিযুক্ত যুবকও শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেননি।
এখন প্রশ্ন একটাই-কেন এই রক্তাক্ত পরিণতি? কী ছিল এই হত্যাযজ্ঞের পেছনের কারণ? উত্তর খুঁজছে পুলিশ, আর চারজন প্রিয়জনকে হারিয়ে অসহনীয় শোক বয়ে বেড়াচ্ছে স্বজনরা।
একটি পরিবার হারিয়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু কান্না, প্রশ্ন আর অমোচনীয় বেদনার স্মৃতি।
